ঢাকা: শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

যন্ত্রণার আইবিএস : কিভাবে চিনবেন, কী করবেন?

আইবিএস
আইবিএসের প্রকৃত কারণ এ পর্যন্ত জানা যায়নি। অনেক কারণে এ রোগ হয় বলে চিকিৎসার আন্তর্নিহিত কারণ উদঘাটন সম্ভব হয়নি

আইবিএস খাদ্যনালির একটি রোগ। সাধারণত অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে এই রোগ হয়। জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তন আনলে রোগ থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া যায়।

ইংরেজি পরিভাষায় পেটের পীড়া আইবিএস হচ্ছে ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম। ইংরেজিতে সিনড্রোম শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে একটি রোগের বিভিন্ন উপসর্গ বা লক্ষণের সমষ্টি। তাই আইবিএসকে পেটের কয়েকটি উপসর্গ বা লক্ষণের সমন্বয়ে সংজ্ঞা হিসেবে ধরা হয়। এ রোগে পেট অধিকতর স্পর্শকাতর হয় বলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল হয়ে থাকে। পাশ্চাত্য দেশে প্রতি ১০ জনে অন্তত একজন মানুষ এ রোগে তার জীবদ্দশায় আক্রান্ত হয়ে থাকে।

আইবিএসের কারণ কী
আইবিএসের প্রকৃত কারণ এ পর্যন্ত জানা যায়নি। অনেক কারণে এ রোগ হয় বলে চিকিৎসার আন্তর্নিহিত কারণ উদঘাটন সম্ভব হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা কারণও প্রভাবক হিসেবে অনেক বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। সেগুলোকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা :
• শারীরবৃত্তীয় কারণ
এর মধ্যে অন্ত্রনালীর বেশি স্পর্শকাতরতা, অন্ত্রনালীর অস্বাভাবিক নাড়াচাড়া, এলার্জি ও ইনফেকশন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ গম ও দুধ জাতীয় খাবার সহ্যক্ষমতা কম অর্থাৎ এ জাতীয় খাবার খাওয়ার পরই আমাশয়ের সমস্যা তথা আইবিএস শুরু হয়।
• মনোসামাজিক কারণ
এ সমস্যায় প্রথমেই আছে হতাশ ও দুশ্চিন্তা ইত্যাদি। এ ছাড়া অধিক মানসিক চাপ ও আইবিএসকে প্রভাবিত করে থাকে। আইবিএসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অল্প সমস্যা হলেই মানসিকভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে ফলে তারা পরিস্থিতি সহজে মানিয়ে নিতে পারে না।

এ ছাড়া খাদ্যাভ্যাস, অন্ত্রের প্রদাহ, অন্ত্রের সংক্রমণ, মাদক গ্রহণ, পেটের অপারেশন, বংশগত কারণ, হরমোনজনিত কারণ বিশেষ করে মহিলাদের মাসিক চক্রের সমস্যা এবং অনেক সময় এন্টিবায়োটিকসহ অনেক ওষুধ সেবনও আইবিএসের সমস্যাকে ত্বরান্বিত করে।

আইবিএসে সাধারণত পেটে ব্যথা থাকবেই। সারা পেট জুড়ে কামড়ে ধরা ও মোচড় মারা ব্যথাই এর প্রধান লক্ষণ। নাভির নীচ থেকে বাঁ দিক চেপে কুঁকড়ে যাওয়া ব্যথাও এর আওতায় পড়ে। বেগ বাড়লে সিগনালিংয়ের চোটে নার্ভ পর্যন্ত ফেলিয়োর হয়। হাত-পা ঠান্ডাও হয়ে যেতে পারে। আবার মলত্যাগ করলেই ব্যথার নিরসন হলে বুঝতে হবে আইবিএস। তবে বারবার বাথরুমে গেলেও প্রত্যেক বার যে মলের পরিমাণ বেশি হবে, তা কিন্তু নয়। আবার মলের ধরন সাধারণত সান্দ্র্য, ঘোলাটে বা তরল হতে পারে। তবে মলের সঙ্গে রক্ত বেরোয় না এবং শরীরে জ্বরভাবও থাকে না। অন্য দিকে আইবিএস সি-র রোগীদের ক্ষেত্রে গ্যাস, পেটের উপরে চাপ, অস্বস্তি, বারবার ঢেঁকুর তোলার মতো লক্ষণ দেখা যায়।

সাধারণত কমবয়সি অর্থাৎ ৪৫ বছরের নীচে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা আইবিএসে ভোগেন। তবে তার মানে এই নয় যে, ষাটোর্ধ্ব কারও এই সমস্যা হবে না। সে ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই এই সমস্যা ব্যক্তিটির আগে থেকেই ছিল। ষাট পেরোনোর পরে প্রথম বার আইবিএসে ভোগার সমস্যা সাধারণত কম হয়। ষাটোর্ধ্ব কেউ আইবিএসের সমস্যা নিয়ে এলে প্রথমেই অন্য পরীক্ষা করে দেখা হয় তাঁর জ্বর, খাদ্যনালীতে ইনফেকশন, টিউমর বা অন্যান্য সমস্যা আছে কি না।

ভারতীয় একজন চিকিৎসক

আইবিএসকে অনেকে ক্যান্সার মনে করে ভয় পায়। এই উদ্বেগ থেকে তাদের পেট খারাপের সমস্যা আরো বেড়ে যায়। কিন্তু এ বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করা উচিত যে এটা ক্যান্সারজাতীয় কোনো সমস্যা নয়; বরং উপযুক্ত চিকিৎসা নিয়ে আইবিএসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে জীবনাচারের অনেক উত্তরণ ঘটে।

আরও পড়ুন
ফুসফুসের কঠিন অসুখ সিওপিডি কী? কেন হয়?

মূলত চার রকমের আইবিএস দেখা যায়- কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়েরিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়েরিয়া এবং কোনওটাই নয় অথচ পেটে সারাক্ষণ অস্বস্তি। প্রথম তিনটি প্রকারভেদেও পেট ব্যথা, পেট ফাঁপা, গ্যাস ইত্যাদির সমস্যা ও অস্বস্তি থাকে। মূলত অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা এবং মানসিক চাপ ও উত্তেজনা (স্ট্রেস ও টেনশন) এই রোগের জন্ম দেয়।

সাধারণত খাবার আইবিএসের জন্য দায়ী নয়। কিন্তু কিছু কিছু খাবার আপনার উপসর্গ বাড়িয়ে দিচ্ছে কি না লক্ষ করুন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা দুধ, দুগ্ধজাত খাবার, কফি, কোমল পানীয়, কিছু কিছু শাক ও ফল খেতে পারেন না। যদি কোনো খাবার খেলে সমস্যা বাড়ে, তবে তা এড়িয়ে দেখতে পারেন।

  • কোষ্ঠকাঠিন্য যাঁদের মূল সমস্যা, তাঁরা আঁশজাতীয় খাবার বেশি খাবেন। ইসবগুলের ভুসি খেতে পারেন।
  • প্রতিদিন ৭-৮ গ্লাস পানি পান করুন।
  • একসঙ্গে অনেক খাবার খেলে পেট ফাঁপে। তাই অল্প অল্প করে সারা দিনে ভাগ করে খান।

আইবিএস থাকলে নিয়মিত প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার খাবেন। প্রোবায়োটিক এক ধরনের ভাল ব্যাকটেরিয়া, যা অন্ত্র এবং ডাইজেস্টিভ সিস্টেমকে ভাল রাখতে সাহায্য করে। কী, চিন্তায় পড়ে গেলেন? কোথায় পাবেন প্রোবায়োটিক? দই প্রোবায়োটিক পাওয়ার সবচেয়ে সহজ এবং সস্তা উৎস। তবে মিষ্টি দইয়ের বদলে টক দই খাবেন। আর হ্যাঁ, দই খাবেন দিনের বেলায়। রাতে দই খেলে কফের সমস্যা হতে পারে।

চিকিৎসা: আইবিএস রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীকে আশ্বস্ত করা চিকিৎসার খুব জরুরি একটি অংশ । আইবিএস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ তবে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ রোগ নয়, সংক্রমক রোগও নয়, এ রোগের কারণে অন্ত্রের ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা নাই- এ কথাগুলো রোগীকে ভালো করে বুঝাতে হবে । বর্তমানে আইবিএস এর চিকিৎসা উপসর্গভিত্তিক।

আরও পড়ুন
বুধ গ্রহ : দিনে আগুন রাতে বরফ

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রোবায়োটিক, অ্যান্টি-স্পাজমটিক, অ্যান্টি-মটিলিটি ওষুধ, মানসিক বিষণ্নতার প্রতিক্রিয়া লাঘব করার জন্য ব্যবহৃত ওষুধ ইত্যাদি আইবিএস চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।

আইবিএস চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগী এবং চিকিৎসক দুজনেরই ধৈর্য্য প্রয়োজন। চিকিৎসক সময় নিয়ে রোগীর সঙ্গে রোগ সম্পর্কে আলোচনা করলে রোগী সাহস পান যে তার রোগটি কঠিন কোনো রোগ নয় এবং এর চিকিৎসা রয়েছে। রোগীদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত, সুশৃঙ্খল ও মানসিক চাপ মুক্ত জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে আইবিএস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

Rent for add

Facebook

for rent