ঢাকা: শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

ফুসফুসের কঠিন অসুখ সিওপিডি কী? কেন হয়?

ফুসফুস
সিওপিডি রোগটি শুরু হলে ধীরে ধীরে এর তীব্রতা বাড়তে থাকে। মানে শ্বাসকষ্ট, কাশি, দম নিতে কষ্ট হওয়া, কফ পড়া ইত্যাদি জিনিস বেশি হয়ে থাকে।

বিশ্বে মৃত্যুহারের অন্যতম একটি কারণ ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি। সিওপিডি একটি জটিল রোগ, যা জিনগত, আচরণগত ও পরিবেশগত কারণ, ধূমপান, পেশাগত দূষণ, বায়ুদূষণ এবং শৈশবে নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণ দিয়ে প্রভাবিত হয়। এ ছাড়া পুষ্টি এবং নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রায়ই রোগটি নির্ণয় করা হয় না এবং পরিণত অবস্থাতেই চিকিৎসা করা হয়। যদিও তরুণদের মাঝেও এটি একটি শারীরিক সমস্যা। সিওপিডি হওয়ার সবচেয়ে প্রধান কারণ ধূমপান।

সিওপিডিতে ফুসফুসের ভেতর ক্ষুদ্র থলে বা অ্যালভিওলাইয়ের কিছু দেয়াল নষ্ট হয়ে যায়। ফুসফুসের ক্ষুদ্র নালিগুলোর স্থিতিস্থাপকতা কমে এবং নালির দেয়াল মোটা হয়ে বাতাস প্রবেশের পথ সরু হয়ে যায়। সিওপিডি শুরু হয় ধীরে ধীরে। সময়ের সঙ্গে এটি বাড়তে থাকে। সাধারণত মধ্যবয়সে বা বৃদ্ধ বয়সে এ রোগ দেখা দেয়।

সিওপিডির লক্ষণ হলো কাশি, কফ, নিশ্বাসে শাঁ শাঁ শব্দ, দম ফুরিয়ে যাওয়া, বুকে চাপবোধ ইত্যাদি। ধূমপানের সঙ্গে এই অসুখের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া বায়ুদূষণ, ধুলা, ধোঁয়া ইত্যাদি ফুসফুসে প্রদাহের সৃষ্টি করে, যা সিওপিডির কারণ হতে পারে। এ রোগের কারণে ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি হয়, যা পুরোপুরি সারানো সম্ভব নয়। রোগীকে নানা ধরনের ইনহেলার, প্রয়োজনে বাড়িতে কম মাত্রার অক্সিজেন ব্যবহার করে জীবন কাটাতে হয়।

সিওপিডি এর প্রাথমিক লক্ষণগুলি চেনা সহজ। সব থেকে সাধারণগুলির মধ্যে রয়েছে –

মাঝে মধ্যে হওয়া শ্বাসকষ্ট/হাঁফ ধরা, বিশেষ করে ব্যায়াম করার পরে
দীর্ঘস্থায়ী বা বারে বারে হতে থাকা কাশি
মিউকাস (কফ) এর উৎপত্তি
উপরের লক্ষণগুলি সময়ের সাথে ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। যদি না প্রথম অবস্থাতে চিকিৎসা হয়, সিওপিডি সহজ কাজের জন্যেও শ্বাসকষ্ট ঘটায়, যেমন জামা কাপড় পরা, খাওয়া, এবং এমনকী খাবার বেড়ে দেওয়ার সময়েও। কোন কোন সময়ে, শ্বাসগ্রহণের জন্য অতিরিক্ত প্রয়াস লাগে এবং আপনি হয়তো দেখেন যে আপনি ক্রমাগত ওজন হারাচ্ছেন এবং আরও দুর্বল হয়ে পড়ছেন।

সাধারণত যাঁরা ধূমপায়ী, তাঁদের এই রোগ হয়। যাঁরা ধূমপান করেন, তাঁদেরই বেশি হয়। এ ছাড়া আরো কারণ রয়েছে। আমাদের মায়েরা যাঁরা গ্রামে আছেন, তাঁরা অনেক সময় লাকড়ি দিয়ে রান্না করেন। চুলায় যখন ফুঁ দিতে থাকেন, তখন কিছু ধুলা শ্বাসনালিতে চলে আসে। তাঁরা ধূমপায়ী নন, তবে ওই যে ধুলাগুলো খাচ্ছেন, তাই তাঁদের সিওপিডি হতে পারে। আর সিওপিডি মানে একটি দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসনালির প্রদাহ। যেটা আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবে না। যাঁদের বয়স বাড়ে, সাধারণত চল্লিশের পরে হয়। অ্যাজমা কিন্তু আগেই যেকোনো বয়সে হতে পারে।

আরও পড়ুন
এ যুগের এক সম্রাট তিনি

সিওপিডি রোগটি শুরু হলে ধীরে ধীরে এর তীব্রতা বাড়তে থাকে। মানে তাঁর শ্বাসকষ্ট, কাশি, দম নিতে কষ্ট হওয়া, কফ পড়া ইত্যাদি জিনিস বেশি হয়ে থাকে।

সচেতনতার অভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৫০ শতাংশ সিওপিডি রোগী শনাক্তের বাইরে থাকে এবং তারা পরবর্তীকালে জটিল অবস্থায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। সিওপিডি রোগ হলে দীর্ঘমেয়াদি কাশি, কাশির সঙ্গে মিউকাসযুক্ত সাদা, আঠালো শ্নেষ্ফ্মা নির্গত হয় ও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। এ রোগের কারণে ফুসফুসে জীবাণু সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া রোগের হঠাৎ অবনতি ঘটতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৫ সালে প্রায় ৩১ লক্ষ রোগীর মৃত্যু হয়েছে এই সিওপিডি-র কারণে। সিওপিডি নিয়ে ‘হু’ যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকছে। কারণ ওই রিপোর্ট বলছে, ২০১৬ সালে সারা বিশ্বে এই রোগীর সংখ্যা ছিল ২৫ কোটি ১০ লক্ষ। প্রতি ১০ সেকেন্ডে সিওপিডি-তে আক্রান্ত হয়ে এক জন রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।

হু প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন এগেনস্ট সিওপিডি’ এবং ‘সিওপিডি ফাউন্ডেশন’-এর যৌথ সমীক্ষা রিপোর্টে এ-ও স্পষ্ট, কী ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সিরিয়ার মানচিত্র মিশে গিয়েছে সিওপিডি-র আগ্রাসনে। ওই রিপোর্টে মার্কিন যুক্তরাষ্টের এক রোগীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি হাসতে পারেন না। কারণ, হাসতে গেলে যে অতিরিক্ত শ্বাসবায়ুর প্রয়োজন হয়, তা ফুসফুস তাঁকে সরবরাহ করতে পারে না। সিরিয়ার এক জন রোগী আবার বলেছেন, সিওপিডি ধরা পড়ার পরে তিনি একা হেঁটে বাজারে যেতে পারেন না। কারণ, দম পান না!

ধূমপান অবশ্যই পরিহার করুন। ধূমপায়ী নিজে ও আশপাশে যারা থাকেন তারা সবাই সমান ক্ষতিগ্রস্থ হয়

সিওপিডি চিকিৎসার সাতটি স্তম্ভ হল-

প্রথম স্তম্ভ : চারপাশের পরিবেশ ধোঁয়ামুক্ত রাখুন। ধূমপান অবশ্যই পরিহার করুন। ধূমপায়ী নিজে ও আশপাশে যারা থাকেন তারা সবাই সমান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। গাড়ীর কালো ধোঁয়া বা কাঠের চুলার ধোঁয়া থেকেও দূরে থাকুন।

দ্বিতীয় স্তম্ভ : নিয়মিত ভ্যাকসিন নিনঃ প্রতিবছরে একবার ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাক্সিন এবং প্রতি ৩-৫ বছরে একবার নিউমোনিয়ার ভ্যাক্সিন নিবেন। এতে ফুসফুসে ইনফেকশনের প্রবনতা কমবে।

তৃতীয় স্তম্ভ : ফুসফুসের পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশ নিন। পুনর্বাসন কার্যক্রম বলতে বোঝায় ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম (যেমন- শরীরের মাংসপেশী নমনীয় ও প্রসারিত করার ব্যায়াম, কাঁধের ব্যায়াম, পায়ের ব্যায়াম, শ্বাসপ্রশ্বাসের মাংসপেশীর শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম ইত্যাদি)। স্বাস্থ্য সম্মত খাদ্যাভ্যাস, রোগীকে তার রোগ সম্পর্কে অবহিতকরণ ইত্যাদির সম্মিলিত প্রয়াস যার মাধ্যমে রোগী তার শারীরিক ও মানসিক উদ্যম ফিরে পায়। এতে অংশ নিলে ফুসফুসের ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাংসপেশীগুলোর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। যারা ফুসফুসের শক্তি কমে যাওয়ায় শারীরিক অক্ষমতার শিকার এবং সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিয়েও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছেন না, তারা এ কার্যক্রমে অবশ্যই অংশ নিবেন। যাদের উপসর্গ যত বেশী তারা তত বেশী লাভবান হবেন। কখনও কখনও হঠাৎ বেড়ে যাওয়া অসুখের চিকিৎসার পরেও পুনর্বাসন প্রয়োজন হতে পারে।

চতুর্থ স্তম্ভ : নিয়মিত ওষুধ ব্যবহার করুন। চিকিৎসকের দেয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী শ্বাসনালী প্রসারিত হয় এমন ওষুধ ব্যবহার করুন। সঠিক পদ্ধতিতে ইনহেলার ব্যবহার জরুরি। এতে শ্বাসনালী প্রসারিত হয় এবং স্বাভাবিক ভাবে বাতাস চলাচল করতে পারে। পর্যাপ্ত শ্বাস আপনার কর্মক্ষমতা বাড়াবে।

পঞ্চম স্তম্ভ : ইনফেকশনের কারণে বেড়ে যাওয়া শ্বাসকষ্ট নিয়ন্ত্রণ করুন।বুকের যেকোনো ধরনের ইনফেকশনে বা অ্যালার্জি জনিত কারণে শ্বাসকষ্ট হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।এরকম হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ইনফেকশন আপনার ফুসফুসকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে এবং কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

আরও পড়ুন
আজব দুনিয়ার আজব কারবার : বিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা যেমন

ষষ্ঠ স্তম্ভ : শরীরের অন্য সকল রোগের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করুন। শরীরে নানারকম রোগ বাসা বাঁধতে পারে। যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হার্টের অসুখ, দুশ্চিন্তা-হতাশা, ঘুমের সমস্যা, এসিডিটি ইত্যাদি। এগুলো ভালভাবে নিয়ন্ত্রণ করুন।

সপ্তম স্তম্ভ : প্রয়োজনে অক্সিজেন /মেশিনের সাহায্যে শ্বাস নিন।

ধূমপান না করা, কলকারখানা ধোঁয়াসহ সব ধরনের ধোঁয়া থেকে দূরে থাকা, তামাক চাষ বন্ধ করা এবং তামাকজাতীয় দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে সিওপিডিও রোগ অনেকটাই বিনাশ করা সম্ভব।

রক্ত পরীক্ষা, এক্সরে, ইসিজি, ফুসফুসের কর্মক্ষমতার পরীক্ষা করে সহজেই এই রোগ নির্ণয় করা যায় । এই রোগের স্থায়ী কোন চিকিৎসা নেই। ওষুধ নিয়মিত খেলে এবং সাস্থ্যবিধি মেনে চললে রোগী অনেক ভাল অনুভব করে। অপারেশন করা হয় কোন কোন ক্ষেত্রে।

সিওপিডি রোগটি আসলে অনেকটাই প্রতিরোধ যোগ্য। রোগটি প্রতিরোধে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এর ফলে রোগের প্রকোপ অনেক কমে আসবে। সিওপিডি থেকে বাঁচতে প্রথমেই ধূমপানকে না বলতে হবে। স্বামী ধূমপান করলে স্ত্রীর এবং বাচ্চার বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। তাই নিজেও ধূমপান করা যাবেনা এবং অন্যদেরও নিষেধ করতে হবে। গৃহস্থলি কাজে স্বাস্থ্য সম্মত চুলা ব্যবহার করতে হবে। দীর্ঘদিন চুলার ধোঁয়া গ্রহণ করলে এই রোগ হতে পারে। তাই চুলার ধোঁয়া বাড়ি থেকে যাতে সরাসরি বের হয়ে যেতে পারে সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে। নিজ এলাকায় বায়ু দূষণ কমিয়ে আনার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ধোঁয়া উৎপন্নকারী কারখানা জনবসতির বাইরে রাখা উচিত। সবাই সচেতন হলে সিওপিডির প্রকোপ অনেক কমে যাবে।

সিওপিডির ফলে বহু লোক কর্মক্ষমতা হারায়, অনেকে মারাও যায়। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর চতুর্থ বৃহত্তম কারণ সিওপিডি। ক্যান্সারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় ফুসফুসের ক্যান্সারে।

সিওপিডি শুরু হয় ধীরে ধীরে। কিন্তু বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় পৌঁছে যে একপর্যায়ে হাঁটাচলা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এটি মধ্যবয়সে বা বৃদ্ধ অবস্থায় ধরা পড়ে। ফুসফুসের ক্ষতি একবার হয়ে গেলে সেটি সারানো সম্ভব নয়। চিকিৎসায় উপসর্গ কিছুটা প্রশমিত রাখা যায় এবং অসুখের গতি একটু হ্রাস করা যায়।

Rent for add

Facebook

for rent