ঢাকা: শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

এ যুগের এক সম্রাট তিনি

রিলায়েন্স
বলা হয়ে থাকে মুকেশ আম্বানি বাস করেন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামি বাড়িতে, যেটির নাম অ্যান্টিলিয়া

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি হচ্ছেন ভারতের মুকেশ আম্বানি। তিনি ভারতের রিলায়েন্স ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের প্রধান। মুকেশ আম্বানির ছোট ভাই হচ্ছেন অনিল আম্বানি। মুকেশ এবং অনিল আম্বানি মূলত উত্তরাধিকার সূত্রেই বিপুল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের অধিকারী হন। রিলায়েন্স ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাদের বাবা ধীরুভাই আম্বানি। ২০০২ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর দুই ভাই ব্যবসার দেখাশোনা করতেন। কিন্তু ব্যবসা পরিচালনা নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হওয়ার পর দুই ভাই রিলায়েন্স গ্রুপ ভেঙে আলাদা হয়ে যান।

রাজকীয় জীবনযাপন করেন মুকেশ আম্বানি ও তার স্ত্রী নীতা আম্বানি। আম্বানি পরিবারে বিলাসবহুল লাইফস্টাইলের জন্য রয়েছে রোল-রয়েস, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজসহ সব দামী ব্র্যান্ডের গাড়ি। নিজস্ব বিমানে ছোটোখাটো অফিসও রয়েছে। বিলাসবহুল কেবিন থেকে মিটিং রুম, হোটেল, ভিডিও গেম খেলার ব্যবস্থা, মিউজিক সিস্টেম সবই রাখা হয়েছে।

সমুদ্রে সময় কাটানোর জন্য ইয়াচ কিনে রেখেছেন আম্বানি। ৫৮ মিটার লম্বা ও ৩৮ মিটার চওড়া এই জলজাহাজের ছাদ পুরোপুরি সোলার গ্লাস দিয়ে তৈরি। ভেতরে রয়্যাল সুইট, পিয়ানোবারসহ ডাইনিং রয়েছে নৈশভোজের ব্যবস্থা।

এসবের পরও সম্পদ বেড়েই চলেছে মুকেশ আম্বানির। বিশ্বজুড়ে করোনা সংকটের মধ্যেও একের পর এক শিখর স্পর্শ করেছেন তিনি।

বলা হয়ে থাকে মুকেশ আম্বানি বাস করেন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামি বাড়িতে, যেটির নাম অ্যান্টিলিয়া। ভারতের মুম্বাই শহরের আলটামাউন্ট রোডে অবস্থিত এই বাড়ির দাম ২০০ কোটি ডলার, যা ভারতের ১৪ হাজার কোটি রুপির সমান। এই বাড়ির চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল আর একটি বাড়িই আছে দুনিয়াতে, সেটি হলো ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রধান প্রশাসনিক দপ্তর বাকিংহাম প্যালেস।

মুকেশ আম্বানি কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করেন। এসব গাড়ির মধ্যে আছে দুটি বেন্টলি বেন্টাগা মার্সিডিজ মেব্যাচ, অ্যাস্টমার্টিন রেপিড, রোলসরয়েস ফ্যান্টম, ল্যান্ডরোভার ডিসকভারি, ল্যান্ডরোভার রেঞ্জ রোভার, এনডেভার, বিএমডব্লিউ ইত্যাদি। এর মধ্যে বেন্টলি বেন্টাগার দাম ৭ কোটি ৬০ লাখ রুপি।

মুকেশ আম্বানি পরিবার ভারতীয় নাগরিক হলেও তার জন্ম কিন্তু ইয়েমেনে। জন্মসাল ১৯৫৭ সালের ১৯ এপ্রিল। ধনকুবের এই ব্যক্তির বাবার নাম ধিরুভাই আম্বানি এবং মায়ের নাম কোকিলাবেন আম্বানি। তিনি তার বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। অনিল আম্বানি নামে মুকেশ আম্বানির আরও এক ভাই ও দুই বোন রয়েছে।

আরও পড়ুন
নারীর হার্ট অ্যাটাকের ৭ লক্ষণ

স্কুল বয়সেই অনন্য মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিলেন তিনি। বিশেষ করে মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করার পর যুক্তরাষ্ট্রের স্টানফোর্ড থেকে এমবিএ করেন। এরপর ১৯৮০ সালে তিনি স্টানফোর্ড থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। তখনো তিনি ধনকুবের হয়ে ওঠেননি। অন্য আর দশটি মধ্যবিত্তের পরিবারের মতোই চলছে জীবন। মুকেশ এবং তার পরিবার প্রথমে মুম্বাইয়ের ভুলেশ্বর এলাকায় থাকতেন। জানেন সেই বাড়িতে কয়টি শোবার ঘর ছিল? গোটা আপার্টমেন্টে ছিল মাত্র দুটি শোবার ঘর। কিন্তু দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে রিলায়েন্স গ্রুপের উত্থানের মাধ্যমে। ষাটের দশকে রিলায়েন্স কোম্পানির ভিত মজবুত হয়ে উঠতে শুরু করে। দিন বদলে যায় মুকেশ পরিবারের। অর্থ-বিত্ত-যশ-খ্যাতি সবই এসেছে এই রিলায়েন্স ইন্ডাস্টিজের মাধ্যমে। দুই বেডরুমের সেই অ্যাপার্টমেন্ট এখন শুধুই স্মৃতি।

রিলায়েন্স কোম্পানি, ইন্ডাস্ট্রিজের আজকের এই ব্যবসায়িক অনন্য উচ্চতা কিন্তু শুধু মুকেশ আম্বানির মেধা আর শ্রমের ফসল নয়। যদিও রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মাধ্যমেই আজকে ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি। এই রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছিলেন মুকেশ আম্বানির বাবা ধিরুভাই আম্বানি। ধিরুভাই আম্বানিকেও ভারতীয় শিল্প ইতিহাসের নায়ক বলেই মানা হয়।

মুকেশ আম্বানির নেতৃত্বেই তেল এবং জ্বালানি সমৃদ্ধ হয়েছে ভারত। মুকেশ আম্বানি তার স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে।

করোনা মহামারির জেরে লকডাউনের সময় যখন ভারতের একের পর এক কলকারখানা, কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, সেইসময় রিলায়েন্স কর্ণধারের সংস্থায় বিনিয়োগের সুনামি আসে। হিসাব করে দেখা গেছে, গোটা লকডাউন পর্বে প্রতি ঘণ্টায় ৯০ কোটি ভারতীয় টাকা আয় করেছেন মুকেশ আম্বানি।

মুকেশ আম্বানির গল্পে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম মনোজ মোদি। ভারতের বাণিজ্যমহলে অবশ্য খুবই পরিচিত নাম এটি। সবাই জানেন, তিনি মুকেশ অম্বানির বাণিজ্যিক পদক্ষেপের পেছনে প্রধান কারিগর। ফেসবুকের সঙ্গে অম্বানীর ৫৭০ কোটি ডলারের চুক্তির বিশ্বকর্মা তিনি। প্রচারবিমুখ মনোজ সম্বন্ধে খুব কমই জানা যায়। এই ব্যক্তি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন আড়ালে রাখতেই ভালবাসেন তিনি। সাক্ষাৎকারও তিনি প্রায় দেন না বললেই চলে। প্রচারবিমুখ নামগুলিই যে ভারতীয় বাণিজ্যের গতি নির্ণায়ক হন, তার প্রমাণ মনোজ মোদী। বণিকমহলের কথায়, সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত সিলমোহর দেওয়ার ব্যাপারে মনোজ মোদীর পরামর্শকে গুরুত্ব দেন অম্বানি।

মুকেশ আম্বানির বড় ছেলের নাম অনন্ত আম্বানি এবং ছোট ছেলের নাম আকাশ আম্বানি। মেয়ের নাম ইশা আম্বানি।

মুকেশের মেয়ে ইশা আম্বানির বিয়ের ছবি

মুকেশের জীবন সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়- সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নিজের বাড়ি ‘অ্যান্টিলা’র দ্বিতীয় তলায় জিমে থাকেন। তবে সেখানে শুধু সময় কাটান না, রীতিমতো শরীর ঘামান তিনি। জিম থেকে বেরিয়ে ৮টার মধ্যে তিনি গোসল সেরে ফেলেন এবং ৮টায় সকারের নাস্তার জন্য প্রস্তুতি নেন।

৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিনি সকালের নাস্তা সারেন। অ্যান্টিলা ১৯ তলায় থাকে তার নাস্তার ব্যবস্থা। কালে তার নাস্তার মেনুতে পেপের জুস রাখা বাধ্যতামূলক। সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। বাড়ির ১৪ তলায় থাকে তার অফিসের জন্য প্রয়োজনীয় ফাইল, ব্যাগ, ল্যাপটপ বা ব্যক্তিগত জিনিসপত্র।

১০টার মধ্যে গুছিয়ে ১০টা ১০ মিনিটের দিকে মায়ের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেন। এর পর ১৬ তলায় স্ত্রী নীতা আর ১৩ তলায় সন্তানদের সঙ্গে দেখা করেন। সব শেষ করে তিনি সাড়ে ১০টার মধ্যে গাড়িতে চেপে বসেন অফিসের উদ্দেশ্যে। মাঝে মাঝে তিনি নিজেও ড্রাইভ করেন।

সাধারণত তিনি ১১টার মধ্যে অফিসে পৌঁছে যান। অফিসে পৌঁছে নজর দেন ব্যক্তিগত সহকারীর করা কর্মতালিকার দিকে। সাড়ে ১১টার মধ্যে সেই তালিকা অনুযায়ী মিটিং বা অন্যান্য কাজ শুরু করেন। সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অফিস করেন মুকেশ আম্বানি।

৮টা থেকে ৯টার মধ্যে বাসায় ফেরেন তিনি। বাসায় ফিরে ১৫ তলায় গিয়ে আগে অফিসের পোশাক ছাড়েন।

৯টা থেকে ১০টার মধ্যে স্ত্রীকে নিয়ে রাতের খাবার সেরে ফেলেন মুকেশ। ডিনারের আয়োজন হয় ১৯ তলায়। তার রাতের খাদ্য তালিকায় থাকে চাপাটি, ভাত, ডাল, সবজি, সালাদ। রাত ১০টা থেকে ১১টায় পরিবারের সবার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা সারেন। এর পর স্ত্রী নিতা ঘুমোতে চলে যান আর মুকেশ টেবিলে বসেন। ঘণ্টাখানেক টেবিলে কিছু অফিসের কাজ সেরে শুয়ে পড়েন।

আরও পড়ুন
আজব দুনিয়ার আজব কারবার : বিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা যেমন

ভারতীয় গণমাধ্যমে এমন প্রতিবেদনও রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে- মুকেশ আম্বানির স্ত্রী নীতা সকালে যে চা খান, সেটা ভারতীয় বাজারে সবচেয়ে দামী চা পাতা থেকে তৈরি হয়। আর যে কাপে তিনি চা খান, তার দাম দেড় কোটি টাকা। আসলে এই কাপ আনা হয়েছে জাপানের ‘‌নোরিতেক’‌ সংস্থা থেকে। কয়েক শো’‌ বছরের পুরনো এই সংস্থাটি চিনামাটির বাসন তৈরি করার জন্য বিখ্যাত। এবং এদের বাসনের দামও আকাশ ছোঁয়া। যে কাপে নীতা চা খান, সেগুলি আবার সোনার পাতে মোড়া!‌ আর এদিকে চা পাতা বাবদই নীতার খরচ মাসে তিনলক্ষ টাকা।

বুলকারি,‌ রাডো, গুচি, কেলভিন ক্লেন, ফসিল— এই সবকটি ব্র্যান্ডেরই ঘড়ির দাম আকাশ ছোঁয়া। এর বাইরে অন্য কোনও সংস্থার বানানো ঘড়ি পরেন না নীতা। বহুমূল্য ঘড়ির বিরাট সংগ্রহ রয়েছে তাঁর কাছে। এরপরে নীতার হাতব্যাগের দাম ফাঁস করেছে পত্রিকাটি। ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা দাম এক একটির, এমন অজস্র হাতব্যাগ রয়েছে নীতার কাছে। ব্যাগের ওপরে নীতার দুর্বলতা সর্বজনবিদিত। তাই প্রায়শই নতুন ব্যাগ ব্যবহার করতে দেখা যায় তাঁকে। পেড্রো, গার্সিয়া, মার্লিনের মতো বহুমূল্য ব্র্যান্ডের জুতো ব্যবহার করেন নীতা। যার দাম শুরুই হয় এক লক্ষ টাকা থেকে। আর, যে জুতো নীতা একবার পরেন, তা আর দ্বিতীয়বার পরতে দেখা যায় না তাঁকে।‌

Rent for add

Facebook

for rent